ভাসা ভাসা ভাষা

“এক দেশে এক রাজা ছিল।রাজার হাতি-শালে হাতি, ঘোড়া-শালে ঘোড়া”- আমাদের ছোট বেলার শুরু এভাবেই। রাজপুত্র-কোটালপুত্র, তেপান্তরের মাঠ, সেই মাঠ পেরোলে রাজকন্যা; সেই কুচবরণ কন্যা যার মেঘ বরণ কেশ। আর সেই মেঘ-বরণ কেশের গল্প পড়তে পড়তে অপেক্ষা করা কবে নিজেরও এমন মেঘের মত চুল হবে। বলা হয়েছিল, “বড় হও, তারপর হবে।” বড় হওার অপেক্ষা করতে করতে পড়া হল লালকমল আর নীলকমল, ব্যাঙ্গমাব্যাঙ্গমী। বাড়ীর আম গাছে দুপুরবেলা একটা কাক এসে বসত, আমার দীর্ঘ দিনের বিশ্বাস ছিল সেই কাক তাই ভুশুণ্ডির কাক। তারপর, হটাত একদিন দেখলাম যে সেই রাজা-রানি, পক্ষিরাজ, ঢাল-তলওয়ার আর ভাল লাগছে না। অন্য কিছু চাই, নতুন কিছু। নীল মলাটের দক্ষিণারঞ্জনের জায়গা নিল প্রোফেসর হেঁসোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি। শিখলাম যে পইতে-ওয়ালা বামুন মরলে বেল গাছে পা ঝুলিয়ে বসে ব্রহ্মদৈত্যিইকরে, বাঁশ-ঝাড়ে পেত্নী থাকেবেই হবে, আর ইলিশ মাছ রান্না হলে মেছো-ভুত বা মামদো-ভুত না এলে বুঝতে হবে যে ভুত-সমাজে বিশাল কিছু গণ্ডগোল বেঁধেছে।

সেই, “কিশোর ভারতী” আর “দেব সাহিত্য কুটির” গুলে খাওয়ার সময় পুরো ব্যাপারটা নিয়ে কিছু ভাবিনি। বাড়িতে মুর্গীর মাংস রান্না হলে ঠ্যাং টা আমার পাতেই পরবে, এটা যেমন স্বাভাবিক, পুরো ব্যাপারটা তখন তেমনি ছিল। বাছ-বিচার না করে হাভাতের মত পড়ে যাওয়া, হজম হোক, বা বদহজম। আমরা সবাই তাই করে গেছি। ভাবিনি, ভাবার দরকার পরে নি। আর পুরো ব্যাপারটায় , বাপ মায়ের অবদান? সেটা যেন কোন বিষয়ই নয়! বই ত কিনে দিতেই হবে। আর শুধু দিলেই হবে না, খাওয়ার টেবিলে ঠ্যাং চিবোতে চিবোতে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে সেই গপ্পের বই নিয়ে জাবর কাটতে হবে।

ইদানীং, নানান ঠ্যালায় পরে ভাবতে হয়, ভাবা প্র্যাকটিস করতে হয়। হটাত দেখা যায় স্কুল কলেজে বাধ্যতামুলক “হিন্দি পাখওয়াড়া” শুরু হয়। শোনা যায় হিন্দি নাকি আমাদের রাষ্ট্রভাষা। ভাষা থেকে  ধীরে ধীরে রাষ্ট্র বড় হতে থাকে। ভারতের আদমসুমারির হিসেবে, দশ হাজারের কম লোক একটা ভাষা বললে সেটা আর ভাষা থাকে না, আমদের রাষ্ট্রের কাছে সেই ভাষা, সেই ভাষিক লোক হয়ে পরে অপাংক্তেয়। এভাবে দিনের পর দিনের এক একটা ভাষা হারিয়ে যায়, কথা বলার লোকের অভাবে। বিজ্ঞ লোকেরা বলেছেন যে একুশ শতকের শেষে বিশ্বের ৪৬% ভাষা মৃত হয়ে যাবে। আমাদের কাছে এই সংখ্যা গুলো নিতান্তই মূল্যহীন, স্রেফ সংখ্যার জোরে বাঙ্গালিরা এখনও অনেক দিন টিকে থাকব। কিন্ত,এ দেশে, ভয়টা অন্য জায়গায়।  দক্ষিণ আফ্রিকার নোবেল জয়ি এক লেখক একটা বিখ্যাত উপন্যাসের শুরুতে তে লিখেছিলেন যে ভাষার জন্ম নাকি সুরহীনতা পুরন করার জন্য।  একটু কান পেতে দেখুন, ভাষা গুলো কেমন পাল্টে যাচ্ছে না? সব দিকে শোরগোল! না, সরকারি খরচে ‘হিন্দি -হিন্দু-হিন্দুস্তান’ পোঁ  এর কথা বলছি না। আমাদের রোজের কথাগুলো তে অকারণ খিচুড়ি রাঁধছি রোজ, তাও আধ-সেদ্ধ। বাংলাটা ইংরেজি , ইংরেজি টা হিন্দি, কার ঘাড়ে ক্যা চাপছে,  ঘাড়ই জানে। আর এই ভাষার বেসুরো ঐক্যতান আমাদের উদাসিন করে তুলছে যাবতীয় ভাষার সৌন্দর্যবোধের প্রতি। প্রেমচন্দের ভাষায় কুরুচিকর গান যেমন কানে লাগে না, তেমনি অম্লান বদনে আমরা শুনে যাই ‘হ্যান্ডরেড পারসেন্ট লাভ, লাভ”, লাভ ক্ষতির হিসেব ছাড়াই। ইংরেজি চার-অক্ষরের শব্দ হয়ে ওঠে আমাদের ভাষিক ক্ষমতার একমাত্র মাপকাঠি। “লজ্জা, ঘৃণা ভয়, তিন থাকতে নয়” এই কথাটা আত্মস্থ করে ‘রোম্যান্টিক’ এর বাংলা করি ‘রোমাঞ্চিক’,  নিরাভরণ হয় নিরাবরণ।

ভাষার অধিকার চিরকাল রাষ্ট্রের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ৫২’র আন্দোলন জন্ম দিয়েছে এক নতুন দেশের, অকল্পনিয় রক্তপাতের বিনিময়ে। ৬১’র আন্দোলনে আমাদের জন্য নিশ্চিত করেছে বর্ণ-পরিচয়ের অধিকার, এবারও রক্তাক্ত। তারপর আবার ১৯৮৫,আবারও রক্ত। ওরা পেরেছিলেন, আমরা পারব?

 

 

 

Advertisements

Leave a comment

Filed under Memoirs or Fiction?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s