জলো বিষয়

বাইরে ঝড় চলছে। তুমুল হাওয়া আর তার সাথে উপুস-ঝুপুস বৃষ্টি। আবার কখনও বৃষ্টির ফাঁকে ফাঁকে উকি দিচ্ছে মিটমিটে তারা। আমি জানালায় বসা, হাতে চা, গায়ে লেপ আর পাশে পোশাকি মন-খারাপ। পাহাড়ের বৃষ্টি নাকি খুব সুন্দর হয়। দেখার চেষ্টা করছি, কিন্তু বার বার মনে পরছে আমার বাড়ীর জানালায় আসা বৃষ্টির কথা। ঝম ঝম করে টিনের চালে পরা বৃষ্টি। দোতালায় আমার পড়ার টেবিলের পাশে জানালা। জানালার বাইরে ছিল মায়ের লাগান কৃষ্ণচুড়া গাছ। সে আরেক আজব গাছ। দেখতে বিশাল, পুরো গাছ তলায় নিয়ম মেনে পাতার কারপেট সাজিয়ে রাখে, মাথায় বাড়তে বাড়তে গলির উপর কাটাকুটি খেলা তার গুলো কে ছুয়ে দেয়, কিন্তু বছর ঘুরে যায়, একটাও ফুল ফোটে না। মে মাসে চার দিক যখন লালে লাল, আমাদের বাড়ীর সেই গাছটা তখনো সবুজ হয়ে বসে থাকত, শীত এলে বড়জোর পাতায় হলুদের ছোপ, কিন্তু ের বেশি রঙ বদলে বড্ড অনীহা। বর্ষা এলেই একবার করে গাছ কাটার হুজুগ উঠত। নিতান্তই আমার কান্নাকাটির ভয়ে প্রত্যেক বছর সেই অকর্মা গাছটা বেঁচে জেত। তবে ইলেক্ট্রিসিটি বোর্ডের লোকেরা নিয়ম মাফিক এসে মই নিয়ে মাথা মুড়িয়ে যেত, তাঁদের মতে আমাদের পাড়ার সব আলোক-বিভ্রাটের দায় ওই গাছটার! এই অপবাদ মেনে নিয়েছে, কিন্তু তাও একটাও ফুল ফোঁটাতে দেখিনি। আমার আনন্দ ছিল রাতে ঘুমনোর সময় মশারির ছাতে ওই ঝিরি ঝিরি পাতার আলো হাওয়া ছবি।

তারপর? তারপর অনেক বছর কেটে গেছে। সেই নড়বরে দোতালা বাড়ি আর নেই। সেখানে একটা বেশ মানানসই একতলা ঘর। সামনে বেশ কিছু ফুলের গাছ। প্রতিবারই যখন বাড়ি যাই, দেখি যে ছোট ছোট টবের গাছ গুলোও ফুলের ভারে নুয়ে আছে। স্যাতস্যাতে পচা পাতার কার্পেটের জায়গায় ঝকঝকে সিমেন্টের উঠোন, মরচে পড়া তার দিয়ে বাঁধা বাঁশের বেড়ার জায়গায় হাল্কা হলুদ রঙ্গা পাঁচিল, তাতে মেরুন গ্রিল বসানো। এখন আর হাতে শামুক লেগে যাওয়ার ভয়ে সতর্ক হয়ে গেট খুলতে হয় না,  বৃষ্টি নামলে ইট  পরে ইট বসিয়ে রাস্তা বানাতে হয় না। দুদিন পর পর লোক লাগিয়ে হটাত গজিয়ে যাওয়া কচুঘেঁচুর জঙ্গল পরিষ্কার করাতে হয় না। আগে শীত যেতে না জেতেই বর্ষা নামত, আর বর্ষা নামলেই শুরু হত রেডিও তে খবর শোনা, এই নদীর জল বাড়ল বলে, বিপদসীমার কত টা নিচে, কালীবাড়ি চরে কি জল উঠে গেছে? আমার কাছে তখন বন্যা মানে ছুটি, স্কুল যাওয়া নেই; উপরতলার তিনটে ঘরে সবাই মিলে পিকনিক করা, বারান্দায় রান্না-বান্না। বাঁশের ভেলায় উঠে জল পার করে বাজার যাওয়া আর বারান্দা থেকে চেঁচিয়ে আশে-পাশের বাড়ীর সাথে গল্প করা।

আরেকটু বড় হওার পর যখন ‘ফ্লাড’এর জলের সাথে ভেসে আসা দুর্গন্ধ বুঝতে শিখলাম, ততদিনে সেই কাঠের দোতালা, অজস্র ঘুণের গুড়ো, প্রত্যেক বছর রাতে জল ঢোকার চিন্তা, এই সব থেকে মজা উধাও হয়ে জায়গা নিল মেজাজ খারাপ। আর সেই মেজাজ খারাপ থেকে মন খারাপ, জল নামার পর থিকথিকে কাঁদা, মরে যাওয়া সাপ ব্যাং ,বহুদিন বাড়ি ময় লেগে থাকা আঁশটে গন্ধ আর আমার নাক মুখ বন্ধ করে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা। ততদিনে পুরনো বাড়ীর পেছনে নতুন ইমারত তৈরি করার কাজ শুরু হয়ে গেছে। ঠাম্মার  সুপুরি আর নারকেল গাছ কাটা পড়েছে, একটা টক কুলের গাছ ছিল, সেটাও গেল। ততদিনে আমি  স্কুল শেষ করে বাড়ীর বাইরে। নতুন বাড়ীর বারান্দায় উঠে বলেছিলাম যে ‘এবার আবার ফ্লাড হোক।বারান্দায় দাঁড়িয়ে জল দেখব’। গেটের পাশে গোলাপি কাগজি ফুলের ঝাড়। নতুন রঙের গন্ধে তখন ঝিমঝিমে নেশা।

তারওপরে, যখন সেই আধ-ভাঙ্গা বাড়ি আর শুধু পাতাওয়ালা গাছের কথা ভুলে যাওয়ার কথা, তখন ঘর বললেই ভেসে উঠে কাঠের মেঝে, তক্তার খাঁজ-যেখানে চোখ রাখলেই দেখতে পেতাম নিচের ঘরের সব কিছু, বারান্দায় দাঁড়িয়ে আঁকশি দিয়ে কুল পারা, আর রাজ্যের হাবি-জাবি সব। মেঘ কাটলে বুঝতে পারি যে স্মৃতি এমনি জিনিস যা উচ্ছে ভাজা কেও বিরিয়ানি বলে চালাতে পারে। তাই পাইন দেখলে মনে হয়, আহা আমার কৃষ্ণচূড়া; পাঁচিল দেখলে মনে হয়,’আহা রে, সেই বাঁশের বেড়া’।

 

Advertisements

Leave a comment

Filed under Memoirs or Fiction?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s