Monthly Archives: February 2017

রাত গভীর হওয়া শুরু করলে ব্যস্ততা বেড়ে যায়, ঠিক  যেখানে রাস্তা  মোড় নিচ্ছে, সেখান টায়। কয়েক টুকরো জড়ানো সংলাপ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ছে  একদিক ওদিক। আশে পাশের বাড়ির জানালার আলো সরল রেখার মত একমাত্রিক হয়ে তটস্থ।পাশের নালায় হটাত হড় হড় করে কিছু একটা পরে যায়, দুর্গন্ধ ঘুরপাক খায় চারদিকে। একটা নিষ্প্রভ আলোয় দেখা যায় রক্তের শীর্ণ ধারা কাঠের পাটাতনের উপর থেকে ছড়িয়ে যায় আস্ফাল্টের উপর। ঘেয়ো কুকুরটাও তা তে মুখ দেয় না, একবার শোঁকে ফিরে গিয়ে আলোর নিচে বসে থাকে।
একটা রোগা লোক টলতে টলতে বেড়িয়ে আসে, চাঁদের আলোয় মুখটা জলে ভেসে আসা মৃতদেহর মত ফ্যাকাশে। একটা হাসির হুল্লড় উঠে আসে রাস্তায় বসে থাকা ছায়াগুলো থেকে,ঘুরপাক খেতে খেতে থাকে। মাঝে মাঝে কয়েকটা জানালা খুলে যায়, ছিটকে বেরয় কিছু আওয়াজ, হিন্দি গান, ঝগড়া, কখনও বা হাঁক ডাক, নতুন লোকের জন্য।

মোড়টা পেরিয়ে একটু এগিয়ে গেলেই বড় রাস্তা। বড় বড় বাড়ি।খোপ খোপ বারান্দা বলে দেয় এখানে অনেক গুলো পরিবারের ঠিকানা। জানালা দিয়ে চোখে পরে রান্নাঘরের  ব্যস্ততা। টি ভি তে চলতে থাকা সিরিয়েল, রাত ন’টার খবর, বাচ্চার চিৎকার, সব কিছু  রঙ উঠে যাওয়া পর্দা ঠেলে বেরিয়ে আসে। হতশ্রী গাছের টব, বারান্দার রেলিং এ নেতিয়ে থাকা শাড়ি। বিকেলে ধুয়ে দেয়া বোধহয়। দূর থেকে ঠেকলে, দাবার ছক মনে হয়  বাড়িটা কে। কিছু  জানালায় ফটফটে আলো, কয়েকটায় মিট্মিটে হলদে বাল্ব, কোনটা বা নিকষ অন্ধকার। জানালা দেখেই বলে দেয়া যেতে পারে যে কার আয় কেমন, কার মাসের শেষে হিসেবে করতে হয়, কার নয়।

মোড়ের এপারে আর ওপারে অনেক ফারাক। আর লোকেরা সেই ফারাকটা স্বযত্নে মেনে চলে। সকালে যখন  বড় রাস্তার বাড়িতে  শুরু হয় চায়ের টুং-টাং, কলের জল, কোলের বাচ্চার ঝামেলা, ওই দিকে তখনও সব শান্ত, ঘুম ভাঙার সময় হয়নি ওদিকে তখন। ওদিকে যখন ধীরে ধীরে জানালা খোলা শুরু হয়, এদিকে তখন ভাত, ডাল , মাছের ঝোল এর পর্ব প্রায় শেষ। আর দুপুর নামতে নামতে ফারাকটা আরো বেশি বোঝা যায়, একদিক যখন দ্বিপ্রাহরিক ক্লান্তি তে ঝিমোয়, অন্যখানে তখন দিন শুরুর ব্যস্ততা।

এভাবেই চলে, পাশা-পাশি, কিন্ত  দূরত্ব বজায় রেখে। অনেকেই ভাবে, আরেকটু মাইনে বাড়লে এবার একটা ভালো জায়গা দেখে উঠে যাওয়া উচিত। তারপর মাসের শেষ, হিসেবের চাপে সব চাপা পরে যায়। এদিক সন্ধ্যায় শাঁখ বাজে, ওদিকে ভীড় জমা শুরু হয়। তারপর, আরো রাতে যখন মোড়ের মাথার পানের দোকানটা  বন্ধ হয়, তখন এই দুটো সমান্তরাল পৃথিবী এক মুহূর্তের জন্য একে  অপরকে ছুঁয়ে যায়। ওদিক থেকে ধাক্কা মেরে বের করে দেয়া এক জোড়া পা টলতে টলতে এসে এবাড়ির দরজায় দাঁড়ায়,পায়  যত্নে বেড়ে দেয়া গরম ভাত। তারপর সেখানেও অন্ধকার নামে।

Leave a comment

Filed under Memoirs or Fiction?

ভাসা ভাসা ভাষা

“এক দেশে এক রাজা ছিল।রাজার হাতি-শালে হাতি, ঘোড়া-শালে ঘোড়া”- আমাদের ছোট বেলার শুরু এভাবেই। রাজপুত্র-কোটালপুত্র, তেপান্তরের মাঠ, সেই মাঠ পেরোলে রাজকন্যা; সেই কুচবরণ কন্যা যার মেঘ বরণ কেশ। আর সেই মেঘ-বরণ কেশের গল্প পড়তে পড়তে অপেক্ষা করা কবে নিজেরও এমন মেঘের মত চুল হবে। বলা হয়েছিল, “বড় হও, তারপর হবে।” বড় হওার অপেক্ষা করতে করতে পড়া হল লালকমল আর নীলকমল, ব্যাঙ্গমাব্যাঙ্গমী। বাড়ীর আম গাছে দুপুরবেলা একটা কাক এসে বসত, আমার দীর্ঘ দিনের বিশ্বাস ছিল সেই কাক তাই ভুশুণ্ডির কাক। তারপর, হটাত একদিন দেখলাম যে সেই রাজা-রানি, পক্ষিরাজ, ঢাল-তলওয়ার আর ভাল লাগছে না। অন্য কিছু চাই, নতুন কিছু। নীল মলাটের দক্ষিণারঞ্জনের জায়গা নিল প্রোফেসর হেঁসোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি। শিখলাম যে পইতে-ওয়ালা বামুন মরলে বেল গাছে পা ঝুলিয়ে বসে ব্রহ্মদৈত্যিইকরে, বাঁশ-ঝাড়ে পেত্নী থাকেবেই হবে, আর ইলিশ মাছ রান্না হলে মেছো-ভুত বা মামদো-ভুত না এলে বুঝতে হবে যে ভুত-সমাজে বিশাল কিছু গণ্ডগোল বেঁধেছে।

সেই, “কিশোর ভারতী” আর “দেব সাহিত্য কুটির” গুলে খাওয়ার সময় পুরো ব্যাপারটা নিয়ে কিছু ভাবিনি। বাড়িতে মুর্গীর মাংস রান্না হলে ঠ্যাং টা আমার পাতেই পরবে, এটা যেমন স্বাভাবিক, পুরো ব্যাপারটা তখন তেমনি ছিল। বাছ-বিচার না করে হাভাতের মত পড়ে যাওয়া, হজম হোক, বা বদহজম। আমরা সবাই তাই করে গেছি। ভাবিনি, ভাবার দরকার পরে নি। আর পুরো ব্যাপারটায় , বাপ মায়ের অবদান? সেটা যেন কোন বিষয়ই নয়! বই ত কিনে দিতেই হবে। আর শুধু দিলেই হবে না, খাওয়ার টেবিলে ঠ্যাং চিবোতে চিবোতে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে সেই গপ্পের বই নিয়ে জাবর কাটতে হবে।

ইদানীং, নানান ঠ্যালায় পরে ভাবতে হয়, ভাবা প্র্যাকটিস করতে হয়। হটাত দেখা যায় স্কুল কলেজে বাধ্যতামুলক “হিন্দি পাখওয়াড়া” শুরু হয়। শোনা যায় হিন্দি নাকি আমাদের রাষ্ট্রভাষা। ভাষা থেকে  ধীরে ধীরে রাষ্ট্র বড় হতে থাকে। ভারতের আদমসুমারির হিসেবে, দশ হাজারের কম লোক একটা ভাষা বললে সেটা আর ভাষা থাকে না, আমদের রাষ্ট্রের কাছে সেই ভাষা, সেই ভাষিক লোক হয়ে পরে অপাংক্তেয়। এভাবে দিনের পর দিনের এক একটা ভাষা হারিয়ে যায়, কথা বলার লোকের অভাবে। বিজ্ঞ লোকেরা বলেছেন যে একুশ শতকের শেষে বিশ্বের ৪৬% ভাষা মৃত হয়ে যাবে। আমাদের কাছে এই সংখ্যা গুলো নিতান্তই মূল্যহীন, স্রেফ সংখ্যার জোরে বাঙ্গালিরা এখনও অনেক দিন টিকে থাকব। কিন্ত,এ দেশে, ভয়টা অন্য জায়গায়।  দক্ষিণ আফ্রিকার নোবেল জয়ি এক লেখক একটা বিখ্যাত উপন্যাসের শুরুতে তে লিখেছিলেন যে ভাষার জন্ম নাকি সুরহীনতা পুরন করার জন্য।  একটু কান পেতে দেখুন, ভাষা গুলো কেমন পাল্টে যাচ্ছে না? সব দিকে শোরগোল! না, সরকারি খরচে ‘হিন্দি -হিন্দু-হিন্দুস্তান’ পোঁ  এর কথা বলছি না। আমাদের রোজের কথাগুলো তে অকারণ খিচুড়ি রাঁধছি রোজ, তাও আধ-সেদ্ধ। বাংলাটা ইংরেজি , ইংরেজি টা হিন্দি, কার ঘাড়ে ক্যা চাপছে,  ঘাড়ই জানে। আর এই ভাষার বেসুরো ঐক্যতান আমাদের উদাসিন করে তুলছে যাবতীয় ভাষার সৌন্দর্যবোধের প্রতি। প্রেমচন্দের ভাষায় কুরুচিকর গান যেমন কানে লাগে না, তেমনি অম্লান বদনে আমরা শুনে যাই ‘হ্যান্ডরেড পারসেন্ট লাভ, লাভ”, লাভ ক্ষতির হিসেব ছাড়াই। ইংরেজি চার-অক্ষরের শব্দ হয়ে ওঠে আমাদের ভাষিক ক্ষমতার একমাত্র মাপকাঠি। “লজ্জা, ঘৃণা ভয়, তিন থাকতে নয়” এই কথাটা আত্মস্থ করে ‘রোম্যান্টিক’ এর বাংলা করি ‘রোমাঞ্চিক’,  নিরাভরণ হয় নিরাবরণ।

ভাষার অধিকার চিরকাল রাষ্ট্রের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ৫২’র আন্দোলন জন্ম দিয়েছে এক নতুন দেশের, অকল্পনিয় রক্তপাতের বিনিময়ে। ৬১’র আন্দোলনে আমাদের জন্য নিশ্চিত করেছে বর্ণ-পরিচয়ের অধিকার, এবারও রক্তাক্ত। তারপর আবার ১৯৮৫,আবারও রক্ত। ওরা পেরেছিলেন, আমরা পারব?

 

 

 

Leave a comment

Filed under Memoirs or Fiction?

জলো বিষয়

বাইরে ঝড় চলছে। তুমুল হাওয়া আর তার সাথে উপুস-ঝুপুস বৃষ্টি। আবার কখনও বৃষ্টির ফাঁকে ফাঁকে উকি দিচ্ছে মিটমিটে তারা। আমি জানালায় বসা, হাতে চা, গায়ে লেপ আর পাশে পোশাকি মন-খারাপ। পাহাড়ের বৃষ্টি নাকি খুব সুন্দর হয়। দেখার চেষ্টা করছি, কিন্তু বার বার মনে পরছে আমার বাড়ীর জানালায় আসা বৃষ্টির কথা। ঝম ঝম করে টিনের চালে পরা বৃষ্টি। দোতালায় আমার পড়ার টেবিলের পাশে জানালা। জানালার বাইরে ছিল মায়ের লাগান কৃষ্ণচুড়া গাছ। সে আরেক আজব গাছ। দেখতে বিশাল, পুরো গাছ তলায় নিয়ম মেনে পাতার কারপেট সাজিয়ে রাখে, মাথায় বাড়তে বাড়তে গলির উপর কাটাকুটি খেলা তার গুলো কে ছুয়ে দেয়, কিন্তু বছর ঘুরে যায়, একটাও ফুল ফোটে না। মে মাসে চার দিক যখন লালে লাল, আমাদের বাড়ীর সেই গাছটা তখনো সবুজ হয়ে বসে থাকত, শীত এলে বড়জোর পাতায় হলুদের ছোপ, কিন্তু ের বেশি রঙ বদলে বড্ড অনীহা। বর্ষা এলেই একবার করে গাছ কাটার হুজুগ উঠত। নিতান্তই আমার কান্নাকাটির ভয়ে প্রত্যেক বছর সেই অকর্মা গাছটা বেঁচে জেত। তবে ইলেক্ট্রিসিটি বোর্ডের লোকেরা নিয়ম মাফিক এসে মই নিয়ে মাথা মুড়িয়ে যেত, তাঁদের মতে আমাদের পাড়ার সব আলোক-বিভ্রাটের দায় ওই গাছটার! এই অপবাদ মেনে নিয়েছে, কিন্তু তাও একটাও ফুল ফোঁটাতে দেখিনি। আমার আনন্দ ছিল রাতে ঘুমনোর সময় মশারির ছাতে ওই ঝিরি ঝিরি পাতার আলো হাওয়া ছবি।

তারপর? তারপর অনেক বছর কেটে গেছে। সেই নড়বরে দোতালা বাড়ি আর নেই। সেখানে একটা বেশ মানানসই একতলা ঘর। সামনে বেশ কিছু ফুলের গাছ। প্রতিবারই যখন বাড়ি যাই, দেখি যে ছোট ছোট টবের গাছ গুলোও ফুলের ভারে নুয়ে আছে। স্যাতস্যাতে পচা পাতার কার্পেটের জায়গায় ঝকঝকে সিমেন্টের উঠোন, মরচে পড়া তার দিয়ে বাঁধা বাঁশের বেড়ার জায়গায় হাল্কা হলুদ রঙ্গা পাঁচিল, তাতে মেরুন গ্রিল বসানো। এখন আর হাতে শামুক লেগে যাওয়ার ভয়ে সতর্ক হয়ে গেট খুলতে হয় না,  বৃষ্টি নামলে ইট  পরে ইট বসিয়ে রাস্তা বানাতে হয় না। দুদিন পর পর লোক লাগিয়ে হটাত গজিয়ে যাওয়া কচুঘেঁচুর জঙ্গল পরিষ্কার করাতে হয় না। আগে শীত যেতে না জেতেই বর্ষা নামত, আর বর্ষা নামলেই শুরু হত রেডিও তে খবর শোনা, এই নদীর জল বাড়ল বলে, বিপদসীমার কত টা নিচে, কালীবাড়ি চরে কি জল উঠে গেছে? আমার কাছে তখন বন্যা মানে ছুটি, স্কুল যাওয়া নেই; উপরতলার তিনটে ঘরে সবাই মিলে পিকনিক করা, বারান্দায় রান্না-বান্না। বাঁশের ভেলায় উঠে জল পার করে বাজার যাওয়া আর বারান্দা থেকে চেঁচিয়ে আশে-পাশের বাড়ীর সাথে গল্প করা।

আরেকটু বড় হওার পর যখন ‘ফ্লাড’এর জলের সাথে ভেসে আসা দুর্গন্ধ বুঝতে শিখলাম, ততদিনে সেই কাঠের দোতালা, অজস্র ঘুণের গুড়ো, প্রত্যেক বছর রাতে জল ঢোকার চিন্তা, এই সব থেকে মজা উধাও হয়ে জায়গা নিল মেজাজ খারাপ। আর সেই মেজাজ খারাপ থেকে মন খারাপ, জল নামার পর থিকথিকে কাঁদা, মরে যাওয়া সাপ ব্যাং ,বহুদিন বাড়ি ময় লেগে থাকা আঁশটে গন্ধ আর আমার নাক মুখ বন্ধ করে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা। ততদিনে পুরনো বাড়ীর পেছনে নতুন ইমারত তৈরি করার কাজ শুরু হয়ে গেছে। ঠাম্মার  সুপুরি আর নারকেল গাছ কাটা পড়েছে, একটা টক কুলের গাছ ছিল, সেটাও গেল। ততদিনে আমি  স্কুল শেষ করে বাড়ীর বাইরে। নতুন বাড়ীর বারান্দায় উঠে বলেছিলাম যে ‘এবার আবার ফ্লাড হোক।বারান্দায় দাঁড়িয়ে জল দেখব’। গেটের পাশে গোলাপি কাগজি ফুলের ঝাড়। নতুন রঙের গন্ধে তখন ঝিমঝিমে নেশা।

তারওপরে, যখন সেই আধ-ভাঙ্গা বাড়ি আর শুধু পাতাওয়ালা গাছের কথা ভুলে যাওয়ার কথা, তখন ঘর বললেই ভেসে উঠে কাঠের মেঝে, তক্তার খাঁজ-যেখানে চোখ রাখলেই দেখতে পেতাম নিচের ঘরের সব কিছু, বারান্দায় দাঁড়িয়ে আঁকশি দিয়ে কুল পারা, আর রাজ্যের হাবি-জাবি সব। মেঘ কাটলে বুঝতে পারি যে স্মৃতি এমনি জিনিস যা উচ্ছে ভাজা কেও বিরিয়ানি বলে চালাতে পারে। তাই পাইন দেখলে মনে হয়, আহা আমার কৃষ্ণচূড়া; পাঁচিল দেখলে মনে হয়,’আহা রে, সেই বাঁশের বেড়া’।

 

Leave a comment

Filed under Memoirs or Fiction?