Monthly Archives: April 2015

সন্ধ্যেবেলা, হাতে চায়ের কাপ আর ল্যাপটপে আমির খান একমনে মারওয়া গেয়ে চলেছেন, ‘পিয়া মোরে অনন্ত দেস গ’ইলবা’। দুপুর থেকে ঘর পরিষ্কার করছি। এবার ছেড়ে যাওয়ার পালা। বেশি দিন হয়নি এখানেও, মাস দশেক, তাতেই যেন অনেক কিছু জমে গেল, শিশিবোতল, কাগজ-কলম, বেশ কিছু বাতিল জিনিস। সব খুটিয়ে দেখছি, একবার গেলে আর ফিরে আসা যায়না। যা থাকবে তা রয়েই যাবে।সব ঝেরে-মুছে যাওয়াই ঠিক করেছি।ইমেইল থেকে পুরনো ছবি,চিঠিপত্তর আগেই বিদায় করেছি।সব নয়, রাজপ্রাসাদে তোলা ছবিগুলো ফেলতে পারিনি, পারিনি রবি বর্মার ছবির সামনে তোলা আমদের অনিচ্ছুক ছবি, আমার ছবি ভাল হয়না বলে ক্যামেরার সামনাটা খুব একটা পছন্দের জায়গা নয় আমার।ফতেহ সিংহ জাদুঘরে যাওয়ার দিনের ছবিও রয়েছে, নীল পাঞ্জাবিতে দারুন দেখতে লাগত।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি,শিলচরের প্লেন অনেক সময় হল আকাশে উড়ে গেছে, আমার ফোন কিন্তু একবারও বাজে নি আর।এই ভাল, এভাবেই ভাল হয়।
10903449_405635789595209_962163796_a
আমির খানের কিন্তু ভাবান্তর নেই।।গেয়েই চলেছেন “না জানু কব ঘর আওয়ে”।আমার ঘরের জানালা দিয়ে সবার ফেরার পথ।এক এক করে স্কুটার গুলো ধুলো উরিয়ে যাচ্ছে, এখানে বৃষ্টি অনেক দেরিতে নামে, ধুলো বেশি হয়।জানালা বন্ধ না করলে এখনি সব লালটে ধুলোয় ম্লান হয়ে যাবে।তবে আজকে ইচ্ছে করছে না।শেষ বেলায় ধুলো পরলেই বা কি ক্ষতি,কৈফিয়ত ত আর দিতে হবে না।কালই কেয়ারটেকার এসে সব চকচকে করে দেবে নতুন লোকের জন্য।আমার আসার আগে এই ঘরে কি থাকত সেটা আমি টেরও পাইনি কোনদিন।জনি, আমাদের কেয়ারটেকারের নিপুন হাতের কারসাজিতে টেবিলে একটা চায়ের দাগ ও থাকে না। অদ্ভুত লোক এই জনি।বহুবছর আগে কেরালা থেকে ভারতের পশ্চিমতম প্রান্তে এসেছিল পেটের দায়ে, তারপর থেকে এখানেই।একদিন ও ছুটি নিতে দেখলাম না।বাড়ীর গল্প করত মাঝে মাঝে,ছেলে মেয়ের কথা শুনতাম।বাড়ি যাবে না?জানতে চাইলেই বলত, ‘এখানে কত কাজ ম্যাডাম।আমি গেলে কি করে চলবে’। রবিবার রবিবার গির্জায় যেত।‘গড ব্লেস’ কথাটা যেন মুখে লেগেই থাকত।অনেক বুঝিয়েও পারিনি যে অর সেই গডের প্রতি আমার কোন বিশ্বাস জন্মায়নি।বল্লেই হেসে বলত, ‘ম্যাডাম, ইউ উইল সি ওয়ান ডে’। আজকে সেই দিন টা দেখার খুব ইচ্ছে করছে।মা দু’বার ফোন করেছন, ধারনা মেয়ে এখনও সেই ছোট্টটি রয়েছে।কাজের জিনিস ফেলে হয়ত অকাজের জিনিসেই ব্যাগ ভরব।বাবা নাকি বাজারে যাচ্ছে, মেয়ে অনেক দিন পর বাড়ি ফিরবে।আমি মায়ের চিন্তা কে ভুল প্রমান করে এক ফাইলের এর এত দিনের সব নথি-পত্র দু ভাগ করছি, একভাগ আমার সঙ্গে যাবে, অন্য ভাগ জনি পোস্ট করে দেবে,ঠিকানা পেলে।জনি ঘুরে গেছে একবার। ট্যাক্সি বলা হয়ে গেছে, জানিয়ে গেল।বললাম বাড়ি যেও জনি। হেসে বল্ল, এত দিনে নাকি এটাই অর ঘর হয়ে গেছে।
“উনক’ দরস দিখাভেক’ আঁখিইয়া তরস’ রহি”- আবার কবে দেখা হবে জানি না।সবার কাছ থেকে ঠিক মত বিদায় নেওয়া হল না আর।সব কাজ সারতেই এত দেরি হয়ে গেল।কথা ছিল বর্ষা নামলে একটা কালো বালির সমুদ্রতটে ঘুরতে যাব,সেখানে নাকি পার্সিদের মন্দির আছে।সোমনাথ টাও বাকি রয়ে গেল।কতবার প্লান করেছিলাম যাওয়ার, প্রত্যেক বার আমার জন্যই বাদ হত, কিছু না কিছু ঝামেলা বাধিয়ে ফেলতাম।ও কিন্ত একবার ও রাগ করত না।পরে হয়ত কোনদিন আবার সোমনাথ ঘুরতে আসব, কিন্তু এই আক্ষেপ টা কি যাবে কোনদিন?ট্র্যাভেল এজেন্সি থেকে আনা ফ্লাইয়ারস গুলো পূজার হাতে ধরিয়ে দিয়েছি, যদি অর ঘুরতে জাওার ইচ্ছে হয়।পুজার খুব মন খারাপ হয়েছে।আমার পরবাসে একমাত্র বন্ধু ছিল।সকালে অফিসে পৌঁছে একবার দেখা না করে কাজ শুরু হত না।অনেকবার বলল আমায় থেকে যেতে, সব নাকি ঠিক হয়ে যাবে। এদের মত সেই ভরসা টা যে কেন নেই আমার। কি অনায়াসে বললাম, “তবে তাই হোক”, অন্তত ও ত তাই ভাবল।একটু কেঁদে ফেলা কি এতটাই কঠিন হয়ে পরেছিল? পুজা ত কত সহজে কাঁদল আমায় জড়িয়ে ধরে।হেসে বলেছিলাম এবার আমার জায়গায় এসো।অভিমান ভরা গলায় বলল,” এত দিনেও এটা তোমার জায়গা হল না!” বলতে পারিনি কিছুই।পুজা বলল, ‘সন্দেশ ভেজনা মুঝে’।পূজার মা মিষ্টি পাঠিয়েছেন, সে গুলোও ব্যাগে নিতে হবে। কার্গো তে দেব, নয়ত ঝামেলা করতে পারে।ও ত হরদম হাতব্যাগে লাইটার নিয়ে চলে যেত আর তারপর সেটা ফেলে জেতে হত।কত দামি লাইটার যে এভাবে গেছে।এবার কি করেছে কে জানে। পৌছতে ত কাল সকাল হয়ে যাবে, তিনটে প্লেন। সব জিনিসপত্র ঠিকঠাক নিলেই হয়।আমার আর ফোন করে মনে করিয়ে দেবার দায়িত্ব থাকল না।আর কবে দেখা হবে,আদৌ হবে কি।দেখা যদি হয়,তাহলে কি কথা হবে,অর রাগের তিব্রতা কমবে কি কোনদিন।
বাইরে অন্ধকার।মাঝরাতে গাড়ী।শস্তার টিকেট এটাই ছিল, তাই পুরো শহর যখন ঘুমে আমি তখন বাড়িমুখো।প্রথম দিন যখন এসেছিলাম তখন ভরদুপুর।আমাদের প্রথম শহর দেখা, সেও সেই কাঠ ফাটা রোদ্দুরে, বাজারে কি ভীড় ছিল সে সময়।অর ভিড় ভাল লাগত।প্রচুর ছবি তুলেছিল, এত মানুষ আর এত রঙ নাকি মন ভাল করে দেয়।প্রথমবার ভিড়ে দমবন্ধ লাগেনি।ও হেসে বলেছিল, ‘সঙ্গদোষ’, তাই হবে হয়ত।নইলে গতকাল বাজার করতে যাওয়ার কথা ছিল, সেটা করলাম না কেন।(অর মায়ের জন্য কেনা শাড়িটা নিয়েছে কিনা কে জানে,নিজে পারবে না বলে আমায় কিনে রাখতে বলেছিল।আশা করি ভুলেনি।)আমরা ঠিক করেছিলাম ও যখন আবার আসবে আমরা ন্যায়মন্দির পাশে সেই পুরনো দিঘির পাশে যাব, শহর জোড়া বিশাল বাগানটা ঘুরে দেখব।সেই রাজপ্রাসাদ, জাদুঘর,মঙ্গল-বাজার, লালবাগের পাশ দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে । এখন সব শুনশান।কিছু সময় পরেই লোকজন উঠে পরবে,তার আগে পর্যন্ত শহর জুরে যেন বিষণ্ণতার চাদর।একটা দুটো গাড়ি ছুটে জাচ্ছে,আমারই মত হয়ত।আগে ভাবতাম যেদিন সব ছেড়ে বাড়ি যাব, সে দিন কি ভালই না লাগবে।অনেক খুজেও সেই ভাল লাগাটাকে ধরতে পারছি না।খুবই কি দরকার ছিল এসবের?কে হিশেব করবে সেটা–স্টেশনের পাশের আলো আর হল্লাও যেন বড় স্তিমিত আজকে।গেলর্ডের বিখ্যাত চায়ের দোকানের সামনে এত রাতেও কিছু লোক দাঁড়ান।আমরা এখানেই চা খেতাম।আজকে ইচ্ছে করল না আর, যদিও আর কোনদিন খাওয়া হবে না। একা ত খাইনি এখানে কোনদিন।মা আবার ফোন করল, আজকের রাত ওরা না ঘুমিয়েই কাটাবেন, জানি।আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।ওস্তাদের গলায় তখন শেষ পঙতি, “উন বিনা মোহে ক’ছু না ভাওবে”

Advertisements

1 Comment

Filed under Memoirs or Fiction?