Monthly Archives: November 2014

নীল মলাটে হাবুডুবু

শনিবার।হাঁসের মাংস দিয়ে দুপুর বেলার খাওয়াটা জুত করে সারার পর বেশ একটা আড্ডা আড্ডা পরিবেশ তৈরি হল। তারপরের দিন রবিবার, কারুরই পড়াশোনার চাপ নেই বিশেষ,তাই বেশ গুছিয়েই রাজা উজির মারা যাবে।এখন আড্ডাটা কি দিয়ে শুরু হল, কি ভাবে শুরু হল তা লিখতে হলে ত মুশকিল, বাঙ্গালির আড্ডার কি আর মা-বাপ থাকে!আলপিন থেকে আলাউদ্দিন, সবেতেই তো তার অবাধ বিচরন।আমরা পাঁচ জন লোক কম করেও দশখানা বিশয় নিয়ে তুমুল হট্টগোল চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ক্যাম্পাসের সেই আড্ডার ঠেকের আশেপাশে লোকজন বলতে কেউ ছিল না, তাই নিশ্চিন্তে গলাবাজি করছি আমরা।হটাৎ দেখা গেল যে আড্ডার বাকি নয়টা বিষয়কে হারিয়ে দিয়ে অনন্যা আর সু’র সুর বেশ সপ্তমে।বিষয়টা বেশ স্পর্শকাতর, “পথের পাঁচালি”টা কার, সত্যজিতের না বিভূতিভূষণের।“লও ঠ্যালা”!বিনা ‘কারনেই’ এই অবস্থা!! ততক্ষনে আমরা বাকিরা দর্শকের ভুমিকায়, যেচে কে আর এই ডুয়েলে নাক গলাতে যায়!যখন কেসটা টেনীদার ভাষায় প্রায় ‘পুদিচ্ছেরি’ হওয়ার রাস্তায়, তখন হটাত করে ময়ের আবির্ভাব।ময় দানব নয়, আমাদের বন্ধু, নিজের স্যারের কাঁচা বাজার এবং বিদ্যুতের বিল দেয়া নিয়ে সকাল থেকে খুব ব্যস্ত ছিল, এখন ফাঁকা হয়ে গন্ধে-গন্ধে, থুড়ি আওয়াজে-আওয়াজে এশে হাজির হয়েছে।

“ওটা সত্যজিতের ও নয়, বিভূতিভূষণের ও নয়, ওটা উপেনের”।ময়ের খিল্লি করার অভ্যাসের আমরা সবাই ভুক্তভোগী, কেউ কিছু মনে করে না।কিন্তু তখন অনন্যা আর সু এক্কেবারে খেপে আগুন হয়ে যা বলল তা এখানে লিখে দিলে ওরা আর আমার মুখদর্শন করবে না, তাই ওটা আপনাদের কল্পনা শক্তির উপর ছেড়ে দিয়ে কহতব্য কথায় ফিরে যাই।নানা বিশেষণ ব্যবহার করার পর ময়কে বলা হল, “যা খুশি একটা বলে দিলেই তো চলবেনা, রিতি মত পাকা-পোক্ত প্রমান পেশ করা হোক। কোথাকার কোন এক উপেন উড়ে এশে জুড়ে বসলেই যেন হল আর কি”! ময় নির্বিকার ভাবে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল, ব্যাগ থেকে দেশলাইয়ের বাক্স খুঁজে সিগারেট টা ধরানোর তোড়জোড় করল, এদিকে সবার পারা চড়ছে তখন।তারপর, একমুখ ধোঁওয়া ছেঁড়ে বলল, “সাগরময় ঘোষ”। প্রথমে উপেন, তারপর দেশ পত্রিকার সেই বিখ্যাত সম্পাদক।সবাই নিশ্চুপে প্রায় দুঃখ করা শুরু করব যে সারাদিনের কাজের চাপে  বেচারার মাথাটা গেছে, তখন অধুনালুপ্ত ষ্টীম-ইঞ্জিনের মত আবারও ধোঁওয়া ছেড়ে ব্যাগ থেকে বের করল একটা নীল মলাট পরানো আনন্দ পাবলিশার্সের বই, “রচনা সংগ্রহ”।সারাদিনের ওইসব কাজ-কম্মে খুশি হয়ে অর স্যার ও কে পড়তে দিয়েছেন।

এই ভাবেই ময়ের হাত ধরেই সাগরময়ের লেখার সাথে পরিচয়। আর বাকিটা, হাবুডুবু।

সাগরময় ঘোষ কে একজন দক্ষ সম্পাদক হিশেবেই আমরা শুনেছি,শুনেছি কারন যে সময় তিনি দেশ সম্পাদনা করতেন, তখন আমরা নেই।শোনা কথা যে তার হাত ধরেই দেশের যশবৃ্দ্ধি।কিন্তু সম্পাদক সাগরময়ের পাশাপাশি যে একজন লেখক সাগরময়ও ছিলেন, এবং শুধু ছিলেন বললে একেবারেই ভুল, দারুন ভাবে ছিলেন, সেটা ওই বইটা না পরলে অজানাই থেকে যেত।যার হাতে তখনকার অন্যতম জনপ্রিয় পত্রিকার সম্পাদনার ভার, যাতে লেখা প্রকাশ হলেই জাতে উঠে যায় লেখকরা, সেই সাগরময় ঘোষ, নিজের সম্পাদনার কালে দেশে স্বনামে কোনোদিন কিছু লেখেননি, এই সংযমই তো তার প্রতি সম্ভ্রম জাগিয়ে তোলার পক্ষে যথেষ্ট, আর ভালবাসা,তা ওনার লেখা পরলে না এসে পারে না।প্রথমত,সাগরময়ের সব থেকে বিখ্যাত লেখা হল “সম্পাদকের বৈঠকে”।মুদ্রিত গল্প গুলো তো আমরা সবাই পড়ি, কিন্তু গল্পের আড়ালে যে গল্প থাকে, সেটাই হল ওই লেখাটার আসল গল্প।আবার এখানেও কিন্তু গল্প আছে।ঠিক কি করে আমাদের না-লেখক সম্পাদক শ্রীযুক্ত ক্ষিতীশ সরকারের জলসা পত্রিকায় লেখা শুরু করলেন আর তারপর ওটা কানাইলাল সরকার বই হিসেবে প্রকাশ করলেন সেটা ওনার ‘হিরের নাকছাবির’ প্রথম টুকরোতেই আছে। উনার লেখাগুলোতে ঠিক কি পরিমানে কল্পনা মেশান হয়েছে সেটার উত্তর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে উনি এড়িয়ে গেছেন।আসলে অত বছরের সম্পাদনার চাকরি তে প্রচুর লেখক কে খুব কাছ থেকে দেখেছেন উনি, বন্ধুর মত পেয়েছেন আর স্বাভাবিক ভাবেই প্রচুর গল্পও ও ঝুলিতে জমা হয়েছে।কিন্তু গল্প তো অনেকেরই থাকে, সেটাকে ঠিক মত পরিবেশন করার যে দক্ষতা সেটা ক’জনের থাকে।সাগরময়ই পারেন আমাদেরকে একটানে গল্প গুলো শোনাতে, শোনাতে বলছি কারন ঠিকই মনে হয় যেন সেই দেশ পত্রিকার অফিস ঘরে বসে গল্প শুনছি, ফ্যান টা আরেকটু জোরে ঘুরলেই হয়ত বিমল করের নস্যির ডিবে থেকে নস্যি উড়ে এসে হাঁচিয়ে দেবে, বা এখনই হয়ত সুশীল রায়ের বোল বোলতার মত হুল ফোটাবে। আর গল্প কি শুধু মাত্র সেই পত্রিকার দপ্তরের! ঠিক যেমন ভাবে আমরা পাই মুজতবা আলির “দেশে বিদেশে”র পাণ্ডুলিপি পড়ার গল্প, বা সুবোধ ঘোষের ‘অযান্ত্রিক’ লিখে ফেলার ঘটনা, বা সেই পুজো-সংখ্যা প্রকাশের আগে বেচারা সম্পাদকের কন্যা-দায় গ্রস্থ পিতার মত আলু-থালু অবস্থা, ঠিক তেমনই পাওয়া যায় ছোটবেলা শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করার অনেক সুখস্মৃতি।কবি নিশিকান্তর সাথে জোট বেঁধে ভুট্টা চুরি করার চেষ্টা থেকে শুরু করে বাদুড়ের মাংস খাওয়া বা তাদের সহপাঠী পাগলা দাশুর গল্প (যার পরিণতি বরই করুন) প্রত্যেকটা ঘটনাই এতদিনের পরেও লেখার জোরে আমাদের কাছে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

সাগরময়ের লেখার একটা দিক হল যে কোথাও ব্যক্তি সাগরময় যে সম্পাদক সাগরময় বা লেখক সাগরময়কে ছাপিয়ে যায়না শুধু তাই নয়, বরং একটা প্রায় নিজস্ব  স্মৃতিমুলক লেখাতেও ব্যক্তি সাগরময় ঠিক ততটুকই যতটুক না হলেই নয়।এটা শুধু লেখকের ক্ষেত্রে নয়, পাত্রপাত্রীদের ক্ষেত্রেও সমান ভাবে প্রযোজ্য।প্রেমেন্দ্র মিত্র, বনফুল,তারাশংকর কি শিব্রাম,যার ব্যাপারেই লিখছেন, সে গুলো এমন যে তাদের ব্যক্তিগত জীবনটা স্বযত্নে পাশ কাটিয়ে গেছেন, যেটা স্মৃতি-মুলক লেখাতে কমই দেখা যায়,বিখ্যাত ব্যক্তিরা লেখক এবং চরিত্র হিসেবে থাকলে তো আরও কম।প্রতিটি লেখার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে পেশাদারিত্তের ছাপ আর একটা অনাবিল ভালবাসা।

পুরো বইটা হল নানা মজার ঘটনা ও গল্পের খনি।সেই পুরনো দিনের স্টাইলে বিজ্ঞাপন দিতে হলে লেখাই যেত, “কি ভাবে ফেলুদার জন্ম হল, সুবোধ ঘোষের হাতের লেখা কে পড়তে পারত, ডাক্তার বলাইচাঁদ কি জ্যোতিষে বিশ্বাস করতেন,বিভূতিভূষণ কি কাঁকড়ার ঝোল ভালবাসতেন, জানতে হলে পরে ফেলুন সাগরময় ঘোষের রচনা-সংগ্রহ”। যদিও খুব লোভ হচ্ছে বিখ্যাত লেখকদের(পড়ুন শরৎচন্দ্র এবং তারাশঙ্কর) সমনামী বিভ্রাটের গল্পটা আপনাদের শুনিয়ে দেওয়ার, কিন্তু সেটা আমাদের সম্পাদকের অসাধারন লেখনির প্রতি অন্যায় করা হবে বলে খুব কষ্টে লোভ সংবরনের চেষ্টা করছি।

ও এই সঙ্কলনে আরেকটা উপরি পাওনা আছে। সেটা হল দণ্ডকারণ্যের বাঘ নামক লেখাটা।কেউ যদি বাকি লেখা গুলো কে বিষয়-বস্তুর কৃতিত্ব মনে করে উড়িয়ে দেওয়ার দুঃসাহস করেও, এই লেখাটা তাঁদের চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

এই দু’পাতা ধরে বকবকানি করার (তমোজিত কাকু বাধ্য করেছে বকবক করতে, তাই গালাগালগুলো আমার প্রাপ্য নয়)মোদ্দা কথাটা হল যে আনন্দ পাবলিশার্সের প্রকাশ করা ওই রচনা সংগ্রহ টা একটা হুলুস্থুল বই এবং না পড়া থাকলে,পেলেই কিন্তু কিনে একটানে পড়ে ফেলবেন।

আর সাহস করে আরেকটা কথা বলার ইচ্ছে করছে।ছোটবেলা থেকে প্রায় তীর্থ করার মত বই মেলায় ঘুরতে এসেছি আর দেখেছি প্রত্যেকটা বইয়ের স্টলে জমাটি আড্ডা,বিশেষত সাহিত্যের দোকানের আড্ডাটা বেশ ভালই জমত,অনেকে থাকত আর হাওয়ায় উড়ত প্রচুর গল্প। আর উদয়ন ঘোষের সেই এক প্যারাগ্রাফ লম্বা ম্যাগ্নাম সংস্করনের আত্মজীবনি মূলক রচনা, বিজিত জেঠুর নানা সময়ের নানা লেখা,সব গুলো তেই কিন্তু প্রচুর গল্পের গন্ধ পাওয়া যায়।এই গল্প গুলো যদি একসাথে করে জন্য মলাটবন্দি করা হয়, তাহলে সেটা আমাদের যুগের সবার কাছে বিরাট পাওনা, কারন গল্প কবিতার আড়ালের যে গল্প সেটা যে কখনও-সখনও আরো সরেস হয়, সেটা তো সাগরময় ঘোষ পরলেই বোঝা যায়।

পুনশ্চঃ ময়ের দাবি অনুযায়ী আমরা সেদিন স্বীকার করে ছিলাম যে পথের পাঁচালি বিচিত্রার সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়েরই।কি ভাবে? সেটা ওই নীল মলাটের বই টা পড়লেই জানতে পারবেন।

/// শিলচরের বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় মুদ্রিত///

Advertisements

Leave a comment

Filed under Memoirs or Fiction?