তোমাকে সখা কত ভালবাসি

চিরকুট এবং

ইস্কুলে আবৃত্তি প্রতিযোগিতা। তাই সন্ধ্যে বেলা মা বসে মেয়েকে মুখস্ত করাচ্ছেন “অবাক কান্ড”, মুখস্ত মানে শুধু ছড়া মুখস্ত নয় কিন্তু। হাত জোড় করে “নমস্কার।কবি সুকুমার রায়ের অবাক কান্ড ” বলা থেকে শুরু করে ছড়া শেষ করার পর আবার হাত জোড় করে “ধন্যবাদ” বলা- কিছুই বাদ যাওয়া চলবে না। ছড়া শিখতে শিখতে হটাৎ করে মেয়ের প্রশ্ন , ” আচ্ছা মা, বিশ্বকবি সুকুমার রায় বলা যাবে না?” আসলে নতুন শব্দ শেখা হয়েছে দিন কয়েক আগেই। তাই মেয়ে ওটা জুড়ে দিতে পারলে বেশ খুশি হয়। শব্দটা বেশ বড়োসড়োও আর বড় বড় শব্দ দিলে নিশ্চয়ই ভালো জিনিস হয় – বড়দের বইয়ের নাম গুলোই তো কত্ত বড় বড় হয় ! মেয়ের প্রশ্ন শুনে মা দু’ মিনিট চুপ। পদার্থবিজ্ঞানের যাবতীয় পরীক্ষায় প্রথম হওয়া মা প্রথমবার হয়তো একটু থমকালেন, ” বলবি ? না রে। একমাত্র রবীন্দ্রনাথকেই বোধহয় বিশ্বকবি বলা হয়।” সেই ‘বোধহয়’-এর সংশয়াতীত ভাবে সুরাহা হয়েছিল রাত্তিরে বাবা বাড়ি ফেরার পর। প্রতি বছর পঁচিশে বৈশাখ এলেই এই…

View original post 485 more words

Advertisements

Leave a comment

Filed under Memoirs or Fiction?

তুমি ভাল থেকো, দেশ

চিরকুট এবং

সেদিন বিকেলে সবাই মিলে চা খেতে যাওয়ার সময়, একজন বন্ধু বলল খাবে না, কারণ রোজা রেখেছে। তখন খেয়াল হলো যে রমজান শুরু হয়েছে। তার মানে এক মাস পরেই ঈদ। সত্যি কথা বলতে কি,  বছর শুরু হলেই যতটা আগ্রহ নিয়ে পূজার ছুটির দিন ক্ষণ দেখে ফেলা হয়, ঈদ বা মহরমের ক্ষেত্রে সেটা কখনোই হয় না। শিলচরের বাড়ির খুব কাছেই ইটখোলা ঈদগাহ। তাই পুজোর সময় যেমন ইটখোলা দুর্গামণ্ডপের মাইকের ” জাগো দূর্গা জাগো দশপ্রহরণধারিনী ” ভেসে আসে, ঠিক তেমনি মুয়াজ্জিনের সুরেলা আজানের সুরও শোনা যায়। তাই এখনও অচেনা জায়গায় হটাৎ সেই রিনরিনে সুর বেজে এলেই বড্ডো বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছে হয়। আর তখন ঈদের দিন  দেখতাম সবাই নতুন জামা পরে ঈদগাহের দিকে যাচ্ছে, দুধ সাদা পাজামা পাঞ্জাবি, কখনো সাথে রঙ্গীন তক্কী। এখন ঈদ কোন দিক দিয়ে  আসে আর যায় সেটা ইসলাম ধর্মাবলম্বী বন্ধু বান্ধবরা না থাকলে হয়তো বুঝতেই পারতাম না ! সেই বন্ধু চা খাবে না বললে তো জানতামই না যে ঈদ আসছে, মানে নূর…

View original post 393 more words

Leave a comment

Filed under Memoirs or Fiction?

সড়ক থেকে চড়ক হয়ে নববর্ষের ফেস্টুনে

চিরকুট এবং

কিছু রাস্তা যেন কিছুতেই ফুরোয় না- যেমন গুয়াহাটি থেকে শিলচর। পিসি সরকার ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া বলে একটা ম্যাজিক দেখাতেন- একটা স্টিলের জগ থেকে জল ঢালছেন তো ঢালছেনই- গেলাস বালতি মগ সব উপছে জল পরেও জগের জল শেষ হচ্ছে না। বাস যতই গুয়াহাটি থেকে শিলচরের দিকে এগোচ্ছে, ততই যেন কেউ ওপর থেকে বালতি বালতি পিচ ঢেলে রাস্তাটাকে আরো লম্বা করে তুলছেন। পথ যেমন দীর্ঘ, রাতও তেমন! আটটা নাগাদ আন্তঃ রাজ্য বাস টার্মিনাস থেকে বাসে উঠে বসে আছি। সঙ্গী ল্যাপটপ ও মোবাইল। আর জানালায় মুখ সেঁটে পাহাড় দেখতে দেখতে যাওয়া। এই নৈশ বাস যাত্রা এক কালে বরাক উপত্যকার মানুষের খুব পরিচিত এবং খুবই অপছন্দের একটা যাত্রা ছিল। তখন প্লেনে ওঠার মুখে এক মুঠো লজেন্স দিতো বটে, কিন্তু প্লেনের টিকেট কাটার ক্ষমতা খুব কম লোকেরই ছিল। তাই কোথাও বেড়াতে যাওয়ার হলে শিলচর থেকে ঢিকির ঢিকির করে গৌহাটি পৌঁছে ট্রেন ধরা আর তারপর ” ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে ” ঘুরাঘুরি করে বাড়ি ফিরতে হলেও…

View original post 577 more words

Leave a comment

Filed under Memoirs or Fiction?

আকাশে মেঘ

চিরকুট এবং

সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর, সব বলার মতো গল্প গুলো ফুরিয়ে গেলে, না বলার গল্প গুলো ধীরে ধীরে নামতে থাকে, গাছ বেয়ে। ওই গাছটায় আগে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী থাকতো। সব জায়গা থেকে সব গল্প জড়ো করে এনে গুছিয়ে রাখতো, কখন কোনটা দরকার পরে সে তো আর জানা থাকে না! তাই এক ঝুড়ি তে রাজপুত্র-রাজকন্যা, একটায় রাক্ষস-খোক্ষস, কোনোটায় অরুণ-বরুণ-কিরণমালা। ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী সেই আস্তানা বহুদিন হলে ছেড়ে গেছে। আর একা একা থাকতে থাকতে রাজকন্যা-রাজপুত্র-, সাত-ভাই-চম্পা সবাই একদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। আসলে গল্পও খুব সৌখিন, মাঝে মাঝে রোদ দেখতে হয়, একদিক ওদিক উল্টে পাল্টে দেখতে হয়, নয় তো ছিড়ে-ফেটে নষ্ট হয়ে যায়, ঠিক যেমন তোরঙ্গে থাকতে থাকতে ঠাকুমার বেনারসি শাড়ী হয়েছিল।

গাছটায় ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী না থাকলেও, নতুন বাসিন্দাদের ঠাঁই হয়েছে এখন। না, হয়েছে বলাটা ভুল হল, হচ্ছে বলা উচিত। রোজই নতুন নতুন মুখ এসে হাজির হচ্ছে। কারুর হাতে পুঁটুলি, কারুর ব্যাগ অথবা কেউ নিছকই হাত-খালি অবস্থায়। নানা জায়গা থেকে না না মুখ। সবাই ঘুমিয়ে…

View original post 320 more words

Leave a comment

Filed under Memoirs or Fiction?

বনেদিয়ানার অহংকার এবং রাষ্টের মার

চিরকুট এবং

মাঝে মাঝে অল্প কিছু দিনে এতো কিছু ঘটে যায় যে কি নিয়ে লিখবো সেটা বুঝে ওঠাই দায় হয়! দুঃখের সাতকাহন গাইবো না কি পেটুকের পাঁচালি ? পুজো আসছে, সুতরাং পুজোটা ‘টপিক্যাল’ হতেই পারে কিন্তু এদিকে যে অনেক জায়গায় বিসর্জনের বাজনা বাজছে বহুদিন ধরে! আমাদের এই পোড়া দেশে গপ্পের অভাব তো কস্মিনকালেও ছিল না, তাই কি নিয়ে বকবক করবো না, সেটাই ভাবতে হয়। যাকগে, আগা মাথা যখন পাচ্ছিই না, প্রথম থেকে শুরু করাটাই নিরাপদ।

সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের কথা মনে আছে? আমার ছিল না, মানে ২o আগস্ট অব্দি একেবারেই ছিল না। ফেসবুকে সময় নষ্ট করতে করতে হটাৎ দেখলাম একটা পোস্ট ঘুরে বেড়াচ্ছে যার মোটমাট বয়ান হলো যে হাই কোর্টের রায় অনুযায়ী ২৪শে আগস্টকে কলকাতার জন্মদিন হিসেবে উদযাপন করলে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। যিনি ফেসবুকে শেয়ার করেছিলেন তিনি ভারতের একজন স্বনামধন্য ইতিহাসের ব্লগার এবং ফটোগ্রাফার, তাই ভুয়ো হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। নোটিশটা থেকে ভকভক করে সামন্ত প্রভুর ঢ্যাঁড়া…

View original post 541 more words

Leave a comment

Filed under Memoirs or Fiction?

“আহ! চুপ কর। ফোন-টোন কিচ্ছু করতে হবে না। “, বলেই গাড়ীর জানালায় মুখ সেঁটে বসে গেল।  আমিও তত সময়ে বদ্ধ কালা, বাইরে আকাশ, সামনে পাহাড়,প্রাণে তখন বর্ষাকালে বসন্ত-বাহার। ব্যাগে সাত দিনের ছুটি-হটাৎ পাওয়া।  তিন দিন রাস্তায়- হাতে রইল চার, তাই “পথে এবার নামো সখা”; ভাগ্যি ভাল, ‘অফ সিজ্যন ‘, তাই মাফলার জড়ানো-ফ্লাক্স বগলে জনস্রোতে  ভাঁটা। রাস্তার দুপাশে ‘ফুডিং এভেলেবেল’ ধাবায় ফাঁকা চেয়ার টেবিল, যেন মেলা খুলেছে, কিন্তু জমে উঠতে এখনো দেরি। রাস্তায় পাহাড়ি পোশাকে ঝলমলে বাচ্ছা, আপেল টুকটুকে গাল, গাছে ঝাঁকে ঝাঁকে পাহাড়ি বুল্বুল।

গাড়ী পাহাড় বেয়ে চলেছে কুমায়নএর দিকে। আমি তাল গুনি, চৌদ্দ মাত্রা- আমির খান গেয়ে যান “পরান কোয়েলিয়া কুকো রহি”; ধিন -নাউকুচিয়া তাল, ধা-ভীম তাল।  সারথী বাবু বলে ওঠেন,” বাকি লৌটনে কে টাইম।” আমরা নামি একটা ছোট্ট কাঠের ঘরের সামনে, বাইরে টেবিল পাতা, গাছের গুঁড়ির তৈরী। খিদেয় পেট চুঁই -চুঁই। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখি গরম পরোটা ভাজা হচ্ছে। খদ্দের আমরা ছাড়া আরেক দল। ”ফরেনোর”, বলে উঠলেন আনন্দ-জী।  ঘুরে দেখি ঢাউস ক্যামেরা নিয়ে গাছে জড়ানো কুমড়ো লতার ছবি তুলছে। ফুলে ভর্তি। দিম্মা পোস্ত-বাটা মাখিয়ে মুচমুচে করে ভেজে দিতেন, সাথে ঘি-ভাতে। মাখন দেয়া পরোটা চিবোতে চিবোতে পোস্ত-বাটার কথা ভাবি। ধোঁয়া ওঠা ঘি-ভাত, কাঁচা লঙ্কা আর গর্মা-গ্রম দহি-পরোটা-তুলনাটা গুছিয়ে তোলার আগেই দেখি পাশের ভদ্দরলোক শেষ টুকরো মুখে পুরছে। তেল জবজবে হাত টা পাঞ্জাবি তে মুছে ফেলেই এক গাল হাসি-

-ছুটি চলছে কিন্তু

-জাহান্নামে যাও। আমি মনোযোগ দিয়ে পরোটা চিবোই। পাশে কমলা-হলুদ কুমড়ো ফুল। আনন্দ জী  শুনি তখনও বলছেন,”অর এক লাও”, মুখে স্বর্গীয় আনন্দ। পোস্ত-মাখা কুমড়ো ফুলের স্বাদ যদি জানতো!

“অর দো ঘন্টে মে মুক্তেশ্বর পৌঁছ জায়েঙ্গে।” রাষ্ট্র-ভাষায় আমাদের অভয় দেন করে আবার যাত্রা শুরু হলো।

গান চলছে, পুরোনো হিন্দি গান, কাশ্মীর কি কলি। গুনগুনিয়ে উঠতে গিয়ে থেমে যাই। যেন এক জগ আগের কথা।  মায়ের হাত ধরে, বাড়ীর পাশেই দিদির বাড়ী-গানের দিদিমণি। শখ মায়ের, উৎসাহ আমার।

রবিবার সকাল- দিদি রান্নাঘরে শাক কাটেন, আমি হারমোনিয়ামে সা রে গা রে সা সাধি। তেলে ফোড়ন পড়ে, দিদি ভূপালি শেখান – মা নি বর্জিত। খাতা দেখে সাদা কালো রীডে সুর খোঁজার চেষ্টা করি। আরোহে দিদি হাত ধরে নিয়ে যান।  অবরোহে একাই  নামি, পা ফস্কে যায়। দিদি এসে পাশে বসেন। সাদা চুল, সাদা শাড়ী, হাতে হুলদের ছোপ।  ভুল করি বারবার, দিদি হাসেন, বলেন, “বাড়ী গিয়ে রেওয়াজ করবি।” আমি বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ি। কোনো কোনো রবিবার দিদির ছেলে রাজু দাদা নেমে আসে,”মায়ের রান্না হতে হতে আমার সাথে চল। ” ভয়ে ভয়ে সিঁড়ি ভাঙি , কাঠের পুরোনো সিঁড়ি , বড্ডো উঁচু। ওপারে অন্য জগত। সেতার , তানপুরা, “ওটা কি?”, রাজু দাদা চিনিয়ে দেয়, ‘সুর মন্ডল।’

-”তুমি পড়াশোনা করো না?” তারে ভয়ে ভয়ে আঙ্গুল ছুইয়ে জিজ্ঞেস করি।

-”এই তো, করছি। ” একটা একটা সুর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে , ঘর থেকে বারান্দা, বারান্দা থেকে বাগান, বাগান থেকে রাস্তা পেরিয়ে যেন আমাদের বাড়ি পর্যন্ত ভেসে যায়।

-“ধুর। এটা  তো গান। তোমার স্কুল নেই? হোমওয়ার্ক নেই?”

সেতারে তার বাঁধতে বাঁধতে হাসি ছড়িয়ে উত্তর, ” হোমে বসে করছি, এই তো আমার হোমওয়ার্ক”, অকাট্য যুক্তি।

দিদি উঠে আসেন, হাতে নারকেল নাড়ু। এবার দেশ রাগ, সুর ঠিক হলে দুটো নাড়ু।একটাও মেলে না।  মন খারাপ করে নাড়ু খাই, দুটোই।

-রেওয়াজ করিসনি?

মাথা নিচু করে ঘাড় নারি।

-কোলে টেনে বোঝান,”না করলে শিখবি কি করে”

দিদি চেষ্টা করে যান। পারেন না। অসুর থেকে ‘অ’ আর বাদ পড়ে  না।  দেশ থেকে কষ্টে- সৃষ্ঠে দূর্গা।

একদিন রাজু দাদা ডেকে বলে, “আমরা শিলচর থেকে চলে যাচ্ছি রে।” ততদিনে বুঝেছি যে চলে যাওয়ার মানে আর ফিরে  না আসা।  দিদি নারকেল নাড়ু খাওয়ান। মাথায় হাত দিয়ে বলেন,”চেষ্টা করিস , ফাঁকি দিসনে আর।  হোমওয়ার্ক দেয়া থাকল তোকে।” মিথ্যে হাসি, জানি পারবো না। কান্না চেপে পুকুর ধার ধরে একা বাড়ী  ফিরি। হারমোনিয়াম খাটের তলায় ধুলোয় ঢাকা পরে।  ফাঁকি দিয়ে লেখাপড়া হয়, গান নয়। তাই ঠোঁট টিপে গলা মেলাই ,” তারিক ক্রু ক্যা উস্কি, যিসনে তুঝে বানায়া।” শহর ছেড়ে গাড়ি আরো উপরে যায়। আনন্দ বাবু গাড়ী থামান, গান বন্ধ হয়। নেমে খাদের ওপারে আঙ্গুল তুলে দেখান- রোদ ঝলমলে হিমালয় ! ‘অফ স্যিজন মে সবকো নসিব নেহি হোতা।” দুজনের চোখে মুগ্ধতা , এত কাছে! আনন্দ বাবু হেসে ওঠেন, ঠিক যেমন দিদি হাসতেন ,সুর চিনিয়ে দিয়ে।

Leave a comment

Filed under Memoirs or Fiction?

রাত গভীর হওয়া শুরু করলে ব্যস্ততা বেড়ে যায়, ঠিক  যেখানে রাস্তা  মোড় নিচ্ছে, সেখান টায়। কয়েক টুকরো জড়ানো সংলাপ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ছে  একদিক ওদিক। আশে পাশের বাড়ির জানালার আলো সরল রেখার মত একমাত্রিক হয়ে তটস্থ।পাশের নালায় হটাত হড় হড় করে কিছু একটা পরে যায়, দুর্গন্ধ ঘুরপাক খায় চারদিকে। একটা নিষ্প্রভ আলোয় দেখা যায় রক্তের শীর্ণ ধারা কাঠের পাটাতনের উপর থেকে ছড়িয়ে যায় আস্ফাল্টের উপর। ঘেয়ো কুকুরটাও তা তে মুখ দেয় না, একবার শোঁকে ফিরে গিয়ে আলোর নিচে বসে থাকে।
একটা রোগা লোক টলতে টলতে বেড়িয়ে আসে, চাঁদের আলোয় মুখটা জলে ভেসে আসা মৃতদেহর মত ফ্যাকাশে। একটা হাসির হুল্লড় উঠে আসে রাস্তায় বসে থাকা ছায়াগুলো থেকে,ঘুরপাক খেতে খেতে থাকে। মাঝে মাঝে কয়েকটা জানালা খুলে যায়, ছিটকে বেরয় কিছু আওয়াজ, হিন্দি গান, ঝগড়া, কখনও বা হাঁক ডাক, নতুন লোকের জন্য।

মোড়টা পেরিয়ে একটু এগিয়ে গেলেই বড় রাস্তা। বড় বড় বাড়ি।খোপ খোপ বারান্দা বলে দেয় এখানে অনেক গুলো পরিবারের ঠিকানা। জানালা দিয়ে চোখে পরে রান্নাঘরের  ব্যস্ততা। টি ভি তে চলতে থাকা সিরিয়েল, রাত ন’টার খবর, বাচ্চার চিৎকার, সব কিছু  রঙ উঠে যাওয়া পর্দা ঠেলে বেরিয়ে আসে। হতশ্রী গাছের টব, বারান্দার রেলিং এ নেতিয়ে থাকা শাড়ি। বিকেলে ধুয়ে দেয়া বোধহয়। দূর থেকে ঠেকলে, দাবার ছক মনে হয়  বাড়িটা কে। কিছু  জানালায় ফটফটে আলো, কয়েকটায় মিট্মিটে হলদে বাল্ব, কোনটা বা নিকষ অন্ধকার। জানালা দেখেই বলে দেয়া যেতে পারে যে কার আয় কেমন, কার মাসের শেষে হিসেবে করতে হয়, কার নয়।

মোড়ের এপারে আর ওপারে অনেক ফারাক। আর লোকেরা সেই ফারাকটা স্বযত্নে মেনে চলে। সকালে যখন  বড় রাস্তার বাড়িতে  শুরু হয় চায়ের টুং-টাং, কলের জল, কোলের বাচ্চার ঝামেলা, ওই দিকে তখনও সব শান্ত, ঘুম ভাঙার সময় হয়নি ওদিকে তখন। ওদিকে যখন ধীরে ধীরে জানালা খোলা শুরু হয়, এদিকে তখন ভাত, ডাল , মাছের ঝোল এর পর্ব প্রায় শেষ। আর দুপুর নামতে নামতে ফারাকটা আরো বেশি বোঝা যায়, একদিক যখন দ্বিপ্রাহরিক ক্লান্তি তে ঝিমোয়, অন্যখানে তখন দিন শুরুর ব্যস্ততা।

এভাবেই চলে, পাশা-পাশি, কিন্ত  দূরত্ব বজায় রেখে। অনেকেই ভাবে, আরেকটু মাইনে বাড়লে এবার একটা ভালো জায়গা দেখে উঠে যাওয়া উচিত। তারপর মাসের শেষ, হিসেবের চাপে সব চাপা পরে যায়। এদিক সন্ধ্যায় শাঁখ বাজে, ওদিকে ভীড় জমা শুরু হয়। তারপর, আরো রাতে যখন মোড়ের মাথার পানের দোকানটা  বন্ধ হয়, তখন এই দুটো সমান্তরাল পৃথিবী এক মুহূর্তের জন্য একে  অপরকে ছুঁয়ে যায়। ওদিক থেকে ধাক্কা মেরে বের করে দেয়া এক জোড়া পা টলতে টলতে এসে এবাড়ির দরজায় দাঁড়ায়,পায়  যত্নে বেড়ে দেয়া গরম ভাত। তারপর সেখানেও অন্ধকার নামে।

Leave a comment

Filed under Memoirs or Fiction?